করোনার বিরুদ্ধে লড়াই এবং প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বক্তৃতা

১৬২

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

১. জাতীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বক্তৃতা দেওয়ার কথা দুপুর একটায়। সরকারিভাবে এই তথ্যটা জানানো হয়েছিল। সেল্ফ আইসোলেশনে থাকা জাস্টিন ট্রুডো রিডো হল কটেজের পোডিয়ামের সামনে আসেন প্রায় ৪০ মিনিট পর। এমন গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর সময়ে বক্তৃতা শুরু করতে ৪০ মিনিট দেরি হলো কেন?

সপ্তাহের শেষ দিন শুক্রবার পর্যন্ত সবকিছুই অনেকটা ঠিকঠাক ছিলো। কানাডার টপ ফিজিশিয়ান ( প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা) থেরেসা ট্যামের রোববারের বক্তৃতাটাই কি পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে অস্থির করে দিলো। করোনা ভাইরাস নিয়ে ফেডারেল পর্যায়ে নিয়মিত ব্রিফিংটা তিনিই করেন।

রোববারের ব্রিফিং এ তিনি ঘোষণা দিলেন, Our window to flatten the COVID-19 curve is narrow’ . তিনি বললেন, কানাডীয়ানদের এক্ষুনি পদক্ষেপ নিতে হবে, নইলে ভাইরাসের বিস্তৃতি রোধ করা কঠিন হয়ে পরবে। তার বক্তৃতা ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায় মিডিয়ায়। নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ দানা বাধে। পুরো রাষ্ট্রই যেনো নড়েচড়ে বসে। সাপ্তাহিক ছুটির দিনেই বসে যায় মন্ত্রীপরিষদের জরুরি বৈঠক।

২. মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকের আলোচনায় ছিল বিমানবন্দরে স্ক্রিনিং জোরদার করা, চারটি প্রধান বিমানবন্দরে সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ওঠানামা সীমিত রাখা। সোমবার সকালেও সেই আলোচনাই ছিল। মর্নিং হেডলাইনে বেশ কয়েকটি মিডিয়া ট্রুডোর ঘোষণার আগাম নিউজেও তাই বলেছিল।

সোমবারের সকালটা অবশ্য অটোয়ার সীমাহীন ব্যস্ততায় কেটেছে। বৈঠকের পর বৈঠক। শলা পরামর্শ। সেই শলাপরামর্শ চূড়ান্ত করতে ভাষণের সময় পেরিয়ে যায়। ট্রুডো চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত চান, থেরেসা ট্যামের সিদ্ধান্ত জানতে চান। চল্লিশ মিনিট পর পোডিয়ামে এসে তিনি আমেরিকা, মেক্সিকো বাদে বিদেশি নাগরিকরা কানাডায় প্রবেশ নিষিদ্ধের ঘোষণা দেন। আগের দিন, এমনকি সকালেও এতোটা কঠোর পদক্ষেপ আলোচনায় ছিল না। হলে এই সিদ্ধান্ত কেন নিতে হলো? একজন সাংবাদিক তাকে এই প্রশ্ন করেছিলেন।

ট্রুডো দ্বিধাহীনভাবে জানিয়েছেন, করোনা সংকটের শুরু থেকেই আমরা কানাডার বেষ্টক্লাশ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য সেবাকর্মী, বিজ্ঞানী এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তাদের পরামর্শেই সোশ্যাল ডিসটেন্স এর পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা যখন বলেছেন, সোশ্যাল ডিসেটেন্সের সাথে বিদেশি প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। আমরা তাই করেছি। আমাদের কাছে কানাডীয়ানদের নিরাপত্তা এবং সুস্থতা হচ্ছে জরুরি এবং অগ্রাধিকার। তা হলে কি এ নিয়ে কোনো মতভিন্নতা ছিল। লকডাউন বা কানাডাকে বিচ্ছিন্ন করার পক্ষে ট্রুডো ছিলেন না। একাধিকবার তিনি এমনি ধারনা দিয়েছেন।

তবে প্রতিবারই তিনি বলেছেন, আমাদের বিশেষজ্ঞরা, চিকিৎসকরা যেটি বলবেন- কানাডীয়ানদের স্বার্থরক্ষায় আমি সেটিই করব। ধারনা করা হচ্ছে, চিকিৎসকদের বিশেষ করে থেরেসো ট্যামের জোড়ালো সুপারিশেই জাস্টিন ট্রুডো বিদেশিদের প্রবেশ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন।

৩.তুমুল এক সংকটের কালে দেওয়া প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভাষণটি কি কেবল নিছক কোনো সরকার প্রধানের? প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ে রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তির বক্তব্য যদি নাগরিকদের মনে আস্থা তৈরি না করে, ভরসা না জাগায়- তা হলে তিনি কিসের নেতা! ট্রুডোর বক্তৃতাটা কেবল একজন নেতার বক্তৃতাই ছিলো না, এটি ছিলো দুর্যোগকালে পরিবারের প্রধান অভিভাবকের বাকী সদস্যদের বুকে আগলে রাখার মতো ব্যাপার। এর আগের বক্তৃতায় তিনি নিজেকে কানাডীয়ানদের পরিবারের ‘এল্ডারলি মেম্বার’ হিসেবে দাবি করেছিলেন। আজকের বক্তৃতায় তিনি যেনো নিজেকে সেই অভিভাবকের জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।

৪.করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে হিমসিম খাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতি আতঙ্কিত নাগরিকদের সামনে দাঁড়িয়েছেন তিনি নির্ভরতার প্রতীক হয়ে। বলেছেন, সংকটের গোড়া থেকেই দেশের সেরা চিকিৎসক, বিজ্ঞানীদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়েছি। তোমাদের স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তোমাদের আশ্বস্থ করতে চাই, পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিশেষজ্ঞদের মতামদের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় প্রতিটি পদক্ষেপই আমরা নেব।

বিদেশিদের কানাডায় প্রবেশের নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছেন। একইসঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত বিমান, মেক্সিকো, আমেরিকার সাথে যোগযোগ স্বাভাবিক রেখেছেন। কানাডার খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সিংহভাগই আসে মেক্সিকো, আমেরিকা থেকে। সেইপণ্যের সরবরাহ যাতে বিঘ্নিত না হয় সেই ব্যবস্থা তিনি রেখেছেন। স্পষ্ট করেই বলছেন, নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নির্বিঘ্ন রাখার সব ব্যবস্থাই তিনি করবেন।

কানাডার নাগরিকদের কথা ভাবতে গিয়ে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস ভ্রমণে থাকা নাগরিকদের কথা ভুলে যাননি।

তিনি বলেন,আমি জানি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত কিংবা ভ্রমণরত কানাডীয়ানদের নিয়ে তোমরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠবে। আমি তোমাদের কথা দিতে চাই, দেশের বাইরে থাকা একজন কানাডীয়ানও আমাদের সহযোগিতার বাইরে থাকবে না। তাদের বিমান পেতে, ঘরে ফিরে আসার খরচের জন্য যদি সহায়তা দিতে হয় সেটি আমি করব। ইতিমধ্যে সে জন্য বিশেষ সহায়তা প্রকল্পও হাতে নেওয়া হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা কানাডীয়ানদের উদ্দেশ্যে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান, যারা দেশের বাইরে আছো, এখনি সময় ঘরে ফিরে আসার, তোমরা ঘরে ফিরে এসো। যারা মাত্র ফিরেছ, তোমরা ঘরে থাকো। কেবল নিজেকেই সুস্থ রাখার জন্যই না, আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা যাতে দরকারী জায়গায় সেবা এবং মনোযোগ দিতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে তোমরা ঘরে থাকো।

ট্রুডো যখন এই কথাগুলো বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিলো বিদেশ বিভূঁইয়ে আটকে পড়া সন্তানের বাবা, সন্তানের মঙ্গল ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে আছেন। নইলে এমন সংকটকালে দেশের প্রধানমন্ত্রী কী না তাদের দেশে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছেন, তাদের আর্থিক সহায়তা পর্যন্ত দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছেন। সত্যিকার অর্থেই ‘পরিবারের এল্ডারলি মেম্বার’ না হলে কি এটা সম্ভব!

৫. নাগরিকদের তিনি ধমক দিচ্ছেন না, নির্দেশ দিচ্ছেন না, হুমকি দিচ্ছেন না। তিনি তাদের ঘরে থাকার জন্য অনুপ্রাণিত করছেন। তিনি বলছেন, নিজেকে ঘরে রেখে তুমি শুধু তোমার সুস্থতাই নিশ্চিত করছো না, তোমার পরিবারের, তোমার চারপাশের মানুষগুলোর সুস্থতাই নিশ্চিত করছো না, স্বাস্থ্য সেবাকর্মীদের প্রয়োজনের দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগও করে দিচ্ছো। এটা এক ধরনের এডজাস্টমেন্ট আমাদের। তিনি পরামর্শ দিচ্ছেন, ঘরে থাকার, সোশ্যাল ডিসটেন্স এর মানে কিন্তু এই না যে কারো সাথে কথাবার্তাই হবে না। টেলিফোনটা হাতে তুলে নাও, কথা বলো, ইমেইল করো।আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তিইতো হচ্ছে পরষ্পরের কাছে আসতে পারার ক্ষমতা, একে অপরের যত্ন নিতে পারার ক্ষমতা। দৈব দুর্বিপাকের সময় তো এটা আরো বেশি জরুরি। কাজেই তোমার বন্ধুদের ফোন করো, চেনাজানা মানুষদের ফোন করো। গ্রোসারী স্টোরে যাবার সময় তোমার প্রতিবেশির খোঁজ নাও, দেখো তার কিছু লাগবে কী না। আর হ্যাঁ, তোমার নিজের জন্য প্রয়োজনের বেশি এখন কিনো না। আরেকটা কথা বলি, বিশেষ প্রয়োজনে যখনি বাইরে যাও ফ্রন্ট লাইনে কাজ করা কর্মীটির কাছে গিয়ে তাকে একটা ধন্যবাদ দাও। তুমুল এই সংকটের কালে দেশের ফ্রন্টলাইনের এই কর্মীরাই কিন্তু সমাজটাকে সচল রেখেছে। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাও।

৬. জাস্টিন ট্রুডো তার বক্তৃতার প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিজের কিংবা তার সরকারের কোনো কৃতিত্ব দাবি করেননি। তিনি বরং চিকিৎসকদের, স্বাস্থ্য সেবাকর্মীদের প্রশংসা করেছেন, প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা থেরেসা ট্যাম এর নাম উল্লেখ করেই তাকে বাহবা দিয়েছেন। শুধু কি প্রধানমন্ত্রী নিজে, তার বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা মুখোমুখি হয়েছিলেন সাংবাদিকদের।
প্রত্যেকেই নিজেদের মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের কথা বলেছেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে উপ প্রধানমন্ত্রীসহ চারজন গুরুত্বপূর্ণমন্ত্রী, সরকারের ট্রেজারি বোর্ডের প্রধান, ক্যাবিনেট কমিটির ভাইসচেয়ার সেখানে বক্তৃতা করেছেন। কিন্তু কেউই একটিবারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নাম উচ্চারণ করেননি, তাকে কোনো বাহবা দেননি, তিনি কি কি করছেন তার বিবরণ দেননি। প্রত্যেকেই বরং স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রশংসা করেছেন, বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা করেছেন। প্রত্যেকেই প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা থেরেসা ট্যামের নাম নিয়ে তার প্রশংসা করেছেন। মন্ত্রীদের কথায় মনে হচ্ছিলো কানাডার করোনা ভাইরাস বিরোধী লড়ইয়ের মূল নেতাই বোধ হয় থেরেসা ট্যাম।

জাস্টিন ট্রুডো স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন, কানাডায় আমরা অত্যন্ত ভাগ্যবান, আমাদের অসাধারণ স্বাস্থ্য সেবাকর্মী আছেন। আমি আবারো তাদের ধন্যবাদ দিতে চাই, তারা আমাদের সুস্থ রাখার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। একই সাথে আমাদের প্রত্যেককে, আমাদের পরিবারকে, আমাদের কমিউনিটিকে সুস্থ রাখার জন্য, আমাদের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার জন্য যা কিছু দরকার, তা করতে সরকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের যে পদক্ষেপই নিতে হউক না কেন, তোমাদের নিশ্চিয়তা দিতে চাই, আমরা একসাথেই সব কিছু করব, প্রিমিয়ার, মেয়র, চিকিৎসক, পরিবারের সদস্যগণ, কমিউনিটি- সবাইকে এক সাথে নিয়েই করব। কারণ, এটাই হচ্ছে কানাডীয়ানদের বৈশিষ্ট্য। আমরা কঠিন সময়ে যুথবদ্ধ হই এবং একে অপরের যত্ন নেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More

Privacy & Cookies Policy
শীর্ষ সংবাদ
লকডাউনে বিপর্যস্ত দেশের নিম্ন শ্রেণির মানুষেরা।রাজধানীর সড়কে আজ বেড়েছে যানবাহনের সংখ্যা।বরগুনার উপজেলার ২০২১ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নব – নির্বাচিত সকল চেয়ারম্যানদেরকে শপথ পাঠলকডাউনে দ্বিতীয় দিনের সেনাবাহিনীর কার্যক্রম।দেশে করোনায় একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর নতুন রেকর্ডকঠোর লকডাউন, বন্ধ সরকারি ও বেসরকারি সব অফিস। Liveমন্ত্রিপরিষদের প্রথম সদস্য হিসেবে করোনা টিকা নিলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আদমেদ পলক।23-01-2020 News Flashtoday news flash১ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়ার নাইকো মামলার অভিযোগ শুনানিউইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের ওয়ানডে স্কোয়াডে ৩ নতুন মুখপৌর নির্বাচনেও ভোট কেন্দ্র ক্ষমতাসীনদের দখলে : খন্দকার মোশাররফরোববার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার বিতরণ করবেন প্রধানমন্ত্রীকরোনায় আরো ২১ জনের মৃত্যু,নতুন শনাক্ত ৫৭৮